লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস ও ফজিলত - কুরআন ও হাদিসের আলোকে
লাইলাতুল কদর সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত জানুন। এই পবিত্র রাতের ফজিলত, ইবাদতের নিয়ম, দোয়া ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানুন আমাদের ব্লগ পোস্টে।
লাইলাতুল কদর ইসলামের সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ রাতগুলোর একটি। এই রাতে কুরআন নাযিল হয়েছে এবং এটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিসসমূহ ও এর ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এই ব্লগ পোস্টে। এখানে পাবেন নির্ভরযোগ্য ইসলামিক তথ্য, কুরআন ও হাদিস থেকে উদ্ধৃতি, এবং কিভাবে এই রাতের সঠিক ইবাদত করা যায় তার দিকনির্দেশনা।
লাইলাতুল কদর কী?
লাইলাতুল কদর ইসলামের অন্যতম পবিত্র ও মহিমান্বিত এক রাত, যা রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। কুরআনের ভাষায়, এটি "হাজার মাসের চেয়ে উত্তম" একটি রাত, যার অর্থ হলো—এই রাতে ইবাদত করলে হাজার মাস ইবাদত করার সমান সওয়াব পাওয়া যায়। এটি সেই রাত, যখন আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হেদায়াতের জন্য পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেন।
লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব সম্পর্কে কুরআনে একটি সম্পূর্ণ সূরা—সূরা কদর অবতীর্ণ হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, এই রাতে ফেরেশতারা জিবরাইল (আ.)-এর নেতৃত্বে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং আল্লাহর রহমত, বরকত ও শান্তি নিয়ে আসেন। হাদিসেও এ রাতের ফজিলত অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বিশ্বাস ও নেক নিয়তের সঙ্গে লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, আল্লাহ তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন।
তবে লাইলাতুল কদর নির্দিষ্ট কোন রাত তা সুস্পষ্টভাবে জানানো হয়নি। তবে অধিকাংশ ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, এটি রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে একটি হয়ে থাকে—বিশেষ করে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাতের মধ্যে লাইলাতুল কদর লুকিয়ে আছে। এ কারণেই রাসুল (সা.) শেষ দশকের রাতগুলোতে অধিক ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছেন এবং নিজেও তা পালন করেছেন।
এই রাতে ইবাদতের মধ্যে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, তাসবিহ, জিকির ও ক্ষমা প্রার্থনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এই রাতে বেশি বেশি দোয়া পড়ার জন্য নবী (সা.) একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন— "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নি।" অর্থাৎ, "হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।"
এই রাত প্রকৃতপক্ষে এক মহাসুযোগ, যা মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। এই রাতে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যমে জীবনের গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং ভবিষ্যতের জন্য কল্যাণ কামনা করা যায়। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এই রাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করা, যথাযথ ইবাদত করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা।
লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব সম্পর্কে কুরআনের আয়াত
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ (সূরা আল-কদর: ১-৩)
অর্থ: “নিশ্চয় আমরা এটি (কুরআন) লাইলাতুল কদরে নাযিল করেছি। তুমি কীভাবে জানবে কী লাইলাতুল কদর? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।”
লাইলাতুল কদরের ফজিলত
১. হাজার মাসের ইবাদতের সমান: লাইলাতুল কদর হলো এমন এক রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই কথাটি সরাসরি আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কদরে উল্লেখ করেছেন— "লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।" অর্থাৎ, এই রাতের ইবাদত, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও অন্যান্য নেক আমল এত বেশি ফজিলতপূর্ণ যে, তা ৮৩ বছরেরও বেশি সময়ের ইবাদতের সমান সওয়াব অর্জনের সুযোগ দেয়।
এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বান্দাদের জন্য শান্তি ও রহমত বর্ষিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও আন্তরিকতার সঙ্গে লাইলাতুল কদরের ইবাদত করে, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। এই রাতের আরেকটি বিশেষত্ব হলো, এতে তাকদির নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ, পরবর্তী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারিত হয় এবং মানুষের জীবনে কী কী ঘটবে, তা আল্লাহ তাআলা লিপিবদ্ধ করেন।
এই রাতের ফজিলত অনন্য, তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত রমজানের শেষ দশকের রাতে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং জান্নাত লাভের আশায় বেশি বেশি দোয়া করা। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে এই রাতের ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করেন।
২. ফেরেশতাদের আগমন: লাইলাতুল কদর এমন এক বরকতময় রাত, যখন অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে— "সে রাতে ফেরেশতারা এবং রূহ (জিবরাইল আ.) তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে প্রত্যেক বিষয়ে অবতরণ করেন। সে রাত শান্তিময়, ফজরের উদয় পর্যন্ত।" (সূরা আল-কদর: ৪-৫)। অর্থাৎ, এই রাতে আল্লাহর বিশেষ নির্দেশে ফেরেশতারা দুনিয়ায় নেমে আসেন এবং মুমিনদের জন্য রহমত ও বরকত নিয়ে আসেন।
এই রাতের অন্যতম বড় ফজিলত হলো, ফেরেশতারা আল্লাহর ইবাদতকারী বান্দাদের জন্য দোয়া করতে থাকেন। বিশেষ করে জিবরাইল (আ.)-এর অবতরণ এই রাতকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে। হাদিসে এসেছে, এই রাতে এত বেশি ফেরেশতা পৃথিবীতে নেমে আসেন যে, তাদের সংখ্যা গগনচুম্বী বালুকণার চেয়েও বেশি হয়ে যায়। তারা আল্লাহর নির্দেশে বান্দাদের গুনাহ মাফের সুসংবাদ দেন এবং যারা ইবাদতে মগ্ন থাকে, তাদের ওপর শান্তি বর্ষণ করেন।
ফেরেশতাদের এই আগমন রাতটিকে এতটাই পবিত্র করে যে, এটি ফজর পর্যন্ত প্রশান্তিময় থাকে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত লাইলাতুল কদরে ইবাদতে মনোযোগী হওয়া, আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং তাঁর অনুগ্রহ লাভের জন্য বেশি বেশি তওবা করা, যেন ফেরেশতারা আমাদের জন্য রহমত কামনা করেন।
৩. গুনাহ মাফের সুযোগ: লাইলাতুল কদর এমন একটি রাত, যেখানে বান্দার জন্য গুনাহ মাফের অপার সুযোগ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয় যে, এই রাতে যদি কেউ একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করে, তবে তার অতীতের সব পাপ মোচন হয়ে যায়।
এই রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের ক্ষমা করতে চান এবং তাদের গুনাহ মাফের ঘোষণা দেন। এজন্য নবী করিম (সা.) তার স্ত্রী আয়েশা (রা.)-কে শিখিয়েছেন, এই রাতে বেশি করে পড়তে— "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা'ফু আন্নি।" অর্থাৎ, "হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, আমাকে ক্ষমা করুন।"
এই রাতে বান্দা যদি আন্তরিকভাবে তওবা করে, কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তাহলে তার সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। অতএব, প্রত্যেক মুমিনের উচিত এই সুযোগ কাজে লাগানো, বেশি বেশি ইবাদত করা, তওবা করা এবং লাইলাতুল কদরের বরকতপূর্ণ রাতকে গুনাহ থেকে মুক্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা।
৪. দোয়া কবুলের রাত: লাইলাতুল কদর এমন এক মহিমান্বিত রাত, যেখানে বান্দার দোয়া কবুল হয়। এটি এমন একটি সুযোগ, যখন আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি অসীম দয়া ও অনুগ্রহ বর্ষণ করেন এবং তাঁর কাছে চাওয়া সবকিছুই কবুল করার প্রতিশ্রুতি দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতের বিশেষ গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, "যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ইবাদত করে এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করে, সে কবুল হয়।"
এই রাতে আল্লাহর রহমতের দরজা পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকে। তাই এই রাতে মুমিনরা তাঁদের সব প্রয়োজন ও ইহকাল-পরকালীন কল্যাণের জন্য দোয়া করে থাকেন। বিশেষ করে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রিয় স্ত্রী আয়েশা (রা.)-কে এই রাতে পড়ার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিখিয়েছেন— "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা'ফু আন্নি।" অর্থাৎ, "হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, আমাকে ক্ষমা করুন।"
এই রাত দোয়া কবুলের এমন একটি মুহূর্ত, যখন বান্দা কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে চাইলেও তিনি তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না। তাই এই রাতকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো উচিত—নিজের ও পরিবারের জন্য কল্যাণ কামনা করা, গুনাহ থেকে মুক্তি চাওয়া এবং জান্নাত লাভের দোয়া করা।
৫. শান্তিময় রাত: লাইলাতুল কদর হলো এক মহিমান্বিত রাত, যা সম্পূর্ণ শান্তি ও রহমতে পরিপূর্ণ। এই রাত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, "সে রাতে শান্তি নেমে আসে, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত স্থায়ী থাকে।" (সূরা আল-কদর: ৫)। অর্থাৎ, এটি এমন এক রাত যখন পৃথিবীতে আল্লাহর অসীম রহমত বর্ষিত হয় এবং বান্দারা আধ্যাত্মিক প্রশান্তি অনুভব করে।
এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং আল্লাহর অনুগ্রহ বান্দাদের ওপর বর্ষিত হয়। যারা ইবাদতে মগ্ন থাকে, তারা মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করে। পাপের বোঝা কমে যায়, অন্তর নরম হয়ে যায় এবং আল্লাহর নৈকট্যের অনুভূতি হৃদয়ে জাগ্রত হয়। এটি এমন এক রাত, যখন শয়তানের প্রভাব ক্ষীণ হয়ে যায় এবং রহমতের দরজা সর্বদা উন্মুক্ত থাকে।
লাইলাতুল কদর সত্যিকার অর্থে এমন এক রাত, যেখানে ইবাদতকারীদের মনে প্রশান্তি নেমে আসে, দোয়া কবুল হয় এবং গুনাহ মাফের সুসংবাদ দেওয়া হয়। যারা এই রাতকে যথাযথভাবে কাজে লাগায়, তারা আধ্যাত্মিক সুখ লাভ করে। তাই আমাদের উচিত এই পবিত্র রাতে বেশি বেশি ইবাদত করা, আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা এবং তাঁর দয়া ও শান্তি অর্জনের জন্য দোয়া করা।
লাইলাতুল কদর কখন?
লাইলাতুল কদর রমজান মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় রাত, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি নির্দিষ্ট করে কোনো একদিন বলা হয়নি, তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন যে এটি রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে একটি। বিশেষ করে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমজানের রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে অনেক ইসলামি পণ্ডিত ও গবেষক মনে করেন, ২৭ রমজানের রাতেই লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আল্লাহ ইচ্ছাকৃতভাবে এ রাতকে গোপন রেখেছেন, যাতে মানুষ শুধু একটি রাতের ওপর নির্ভর না করে বরং শেষ দশকের সব রাতেই বেশি বেশি ইবাদত করে।
লাইলাতুল কদরের রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং আল্লাহর নির্দেশে বান্দাদের জন্য রহমত, বরকত ও শান্তির দোয়া করেন। এটি এমন এক রাত, যখন আল্লাহ তাআলা বান্দাদের গুনাহ মাফ করে দেন এবং যাদের অন্তর পরিশুদ্ধ ও যারা আন্তরিকভাবে ইবাদত করে, তাদের জন্য জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতের গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন, যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে বেশি করে ইবাদত করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং তাসবিহ-জিকির করা।
এই রাতের কিছু বিশেষ লক্ষণ রয়েছে, যার মাধ্যমে কিছুটা বোঝার চেষ্টা করা যায়। বলা হয়, লাইলাতুল কদরের রাতে আবহাওয়া থাকে শান্ত, গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডা থাকে না, বাতাস থাকে স্নিগ্ধ ও মৃদুমন্দ। সেই রাতের সকালেও সূর্যের আলো হয় কোমল ও কিরণহীন। তবে এসব লক্ষণ দেখা গেলেও কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না, কারণ লাইলাতুল কদরের সঠিক সময় আল্লাহই জানেন। এ কারণে প্রত্যেক মুমিনের উচিত শেষ দশকের প্রতিটি বিজোড় রাতে ইবাদতে মনোযোগী হওয়া এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করা, যেন তিনি আমাদের লাইলাতুল কদরের সওয়াব দান করেন। বিশেষ করে এই রাতে বেশি বেশি পড়তে বলা হয়েছে— "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা'ফু আন্নি", যার অর্থ— "হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, আমাকে ক্ষমা করুন।" আল্লাহ যেন সবাইকে এই বরকতময় রাতের ফজিলত লাভ করার তাওফিক দেন।
লাইলাতুল কদরের সুন্নত ও করণীয় আমল
লাইলাতুল কদর ইসলামের এক মহিমান্বিত ও বরকতময় রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই রাতের বিশেষত্ব হলো, এতে আল্লাহ তাআলা বান্দার সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন, তাকদির নির্ধারণ করেন এবং রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। তাই এই রাতে বিশেষ কিছু সুন্নত ও করণীয় আমল রয়েছে, যা করলে একজন মুমিন অসংখ্য সওয়াব অর্জন করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এই রাতকে গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত করতেন এবং সাহাবিদেরও তাতে উৎসাহিত করতেন।
এই রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া। রাসুল (সা.) এই রাতগুলোতে রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং সাহাবিরাও এর অনুসরণ করতেন। তাই মুমিনদের উচিত, লাইলাতুল কদরের সন্ধানে রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে নফল নামাজ আদায় করা, বিশেষ করে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া। এছাড়া কুরআন তিলাওয়াত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। কুরআন নাজিলের রাত হিসেবে লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব অনেক বেশি, তাই কুরআনের অর্থসহ তিলাওয়াত করলে সওয়াব আরও বৃদ্ধি পাবে।
এই রাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার ওপর। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আয়েশা (রা.)-কে এই রাতে বিশেষ দোয়া পড়তে বলেছেন: "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা'ফু আন্নি"— অর্থাৎ, "হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, আমাকে ক্ষমা করুন।" তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত এই দোয়া বেশি বেশি পড়া এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
এছাড়া এই রাতে জিকির ও তাসবিহ পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। "সুবহানাল্লাহ", "আলহামদুলিল্লাহ", "আল্লাহু আকবার" ইত্যাদি জিকির বারবার করলে হৃদয়ে প্রশান্তি আসে এবং আল্লাহর রহমত লাভ হয়। দান-সদকা করাও এই রাতের অন্যতম সেরা আমল। যেহেতু এটি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, তাই এ রাতে যে কোনো ভালো কাজ করলে তার সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লাইলাতুল কদর নির্দিষ্ট কোনো দিনে নির্ধারিত নয়, তাই শুধু এক রাতের জন্য অপেক্ষা না করে রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই ইবাদতে মনোযোগী হওয়া উচিত। যারা সত্যিকারের ইবাদত করতে চায়, তাদের উচিত এই রাতের সময়টাকে ইবাদত, দোয়া, তওবা ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য ব্যয় করা, যাতে তারা আল্লাহর দয়া ও রহমত লাভ করতে পারে।
FAQ
১. লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট তারিখ কী?
➡️ ইসলামে নির্দিষ্ট তারিখ নেই, তবে এটি রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে হয়ে থাকে।
২. লাইলাতুল কদরে কোন দোয়া বেশি পড়তে হয়?
➡️ اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
৩. লাইলাতুল কদরে কিভাবে ইবাদত করা উচিত?
➡️ নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির ও ইস্তেগফার করা উচিত।
৪. লাইলাতুল কদরের রাতে কী ঘটেছিল?
➡️ এই রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয় এবং ফেরেশতারা পৃথিবীতে অবতরণ করেন।
৫. লাইলাতুল কদরের নামাজ কত রাকাত?
➡️ এটি নির্দিষ্ট নয়, তবে ২, ৪, ৬, ৮ বা ১০ রাকাত পড়া যায়।
৬. লাইলাতুল কদরের ইবাদত করলে কী লাভ হয়?
➡️ হাজার মাসের ইবাদতের সমান সওয়াব পাওয়া যায়।
৭. লাইলাতুল কদরের সময় কীভাবে ইবাদত করলে গুনাহ মাফ হবে?
➡️ এই রাতে আন্তরিকভাবে ইবাদত করলে আল্লাহ পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন।
৮. লাইলাতুল কদরের ইবাদত কি শুধুমাত্র রাতে করতে হয়?
➡️ হ্যাঁ, এটি সূর্যাস্তের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত করা উত্তম।
৯. লাইলাতুল কদরের ইবাদত ঘরে করা যাবে কি?
➡️ হ্যাঁ, ঘরে কিংবা মসজিদে উভয় স্থানেই করা যায়।
১০. লাইলাতুল কদরের রাতে সুন্নত আমল কী কী?
➡️ নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, তওবা, দোয়া ও গরীব-দুঃখীদের সাহায্য করা।
লেখক এর মন্তব্য
লাইলাতুল কদর ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাপূর্ণ রাত। এটি এমন এক রাত, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য অফুরন্ত রহমত ও মাগফিরাতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। পবিত্র কুরআনে এ রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে, যা নির্দেশ করে এর অসীম গুরুত্ব ও ফজিলত। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) লাইলাতুল কদর লাভের জন্য রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে বিশেষভাবে ইবাদত করতে উৎসাহিত করেছেন।
এই মহিমান্বিত রাতে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, দোয়া ও ইস্তিগফার করা উচিত। পাশাপাশি, গুনাহ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা ও সঠিক পথে চলার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা জরুরি। লাইলাতুল কদর আমাদের জীবনের একটি অনন্য সুযোগ, যা যথাযথভাবে কাজে লাগানো উচিত।
আমরা যেন সবাই এই রাতের পূর্ণ ফজিলত অর্জন করতে পারি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি—এটাই আমাদের একান্ত কামনা।