শবে বরাত ২০২৫ কত তারিখে? শবে বরাতের গুরুত্ব ও করণীয়

শবে বরাত ২০২৫ সালে কবে পড়বে? শবে বরাতের তারিখ, ধর্মীয় গুরুত্ব, ইসলামের নির্দেশনা, সঠিক পদ্ধতি 

শবে বরাত ২০২৫ কত তারিখে? শবে বরাতের গুরুত্ব ও করণীয়

শবে বরাত মুসলমানদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাত, যা ক্ষমা, দোয়া এবং ইবাদতের বিশেষ সুযোগ প্রদান করে। ২০২৫ সালে শবে বরাত কবে পড়বে, তা জানার জন্য অনেকেই আগ্রহী। এই ব্লগ পোস্টে আমরা শবে বরাতের সঠিক তারিখ, এর ধর্মীয় গুরুত্ব, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে তা পালনের পদ্ধতি, এবং এ সম্পর্কিত আরও নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো।

শবে বরাত ২০২৫ কত তারিখে?

শবে বরাত মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত, যা ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের রাত হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০২৫ সালে শবে বরাত পালিত হবে ২৬ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার। সাধারণত, ইসলামি ক্যালেন্ডারের ১৪ শাবান রাতে শবে বরাত পালন করা হয়, যা চন্দ্র মাসের উপর নির্ভর করে।

আরও পড়ুন: রমজানের ফজিলত রোজা, ইবাদত ও রহমতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই রাতে মুসলমানরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় নফল নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত এবং দোয়া-ইস্তেগফার করে থাকেন। অনেকে এ রাতে কবরস্থানে গিয়ে প্রিয়জনদের জন্য দোয়া করেন। শবে বরাতের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, এ রাতে মহান আল্লাহ বান্দাদের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং রহমতের দরজা খুলে দেন।

তবে শবে বরাত পালনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিদআত বা অমূলক প্রথা অনুসরণ না করে মূল ইসলামি শিক্ষার ভিত্তিতে ইবাদত করা উচিত। অনেক মুসলিম দেশেই এ রাতটি বিশেষ গুরুত্বসহকারে পালন করা হয়। বাংলাদেশেও এ উপলক্ষে মসজিদগুলোতে বিশেষ ইবাদতের ব্যবস্থা করা হয়। শবে বরাতের মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে তার সন্তুষ্টি অর্জন করা।

সুতরাং, এ রাতে আন্তরিক চিত্তে ইবাদত করা ও পাপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য দোয়া করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।

শবে বরাতের ধর্মীয় গুরুত্ব

শবে বরাত ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাতগুলোর মধ্যে একটি, যা বিশেষভাবে ইবাদত, দোয়া এবং গুনাহ মাফের সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি মূলত হিজরি বর্ষপঞ্জির শাবান মাসের ১৪ তারিখের রাতকে নির্দেশ করে। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন এবং তাদের গুনাহ ক্ষমার সুযোগ দেন।

আরও পড়ুন: ২০২৫ সালের রমজান কত তারিখ? | রোজার সময়সূচি ও গুরুত্ব

এজন্য মুসলমানরা এই রাতটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালন করে থাকে। শবে বরাতের গুরুত্ব নিয়ে হাদিস শরিফে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। বলা হয়, এই রাতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডেকে বলেন, "কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।

কোনো রিজিক চাওয়ার মানুষ আছে কি? আমি তাকে রিজিক দেব।" এভাবে সারা রাত আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য রহমতের দরজা খুলে রাখেন। তবে এই রাতে আল্লাহ মুশরিক ও হিংসাপূর্ণ মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের ক্ষমা করেন না বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।

মুসলিম সমাজে শবে বরাত পালনের বিভিন্ন রীতি প্রচলিত আছে। কেউ পুরো রাত ইবাদত-বন্দেগিতে কাটান, আবার কেউ নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত ও জিকির-আজকারের মাধ্যমে রাতটি অতিবাহিত করেন। অনেকেই আত্মশুদ্ধির জন্য দোয়া করে থাকেন, কারণ এটি গুনাহ থেকে মুক্তির একটি সুবর্ণ সুযোগ।

ইসলামী বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, এই রাতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নফল ইবাদত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, কুসংস্কার বা নতুন প্রথা অনুসরণ করা উচিত নয়।

শবে বরাতের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, অনেকে এই রাত উপলক্ষে কবর জিয়ারত করে থাকেন। এটি সুন্নাত কাজ, কারণ রাসূল (সা.) মাঝে মাঝে কবরস্থানে গিয়ে মাগফিরাতের দোয়া করতেন। তবে শবে বরাতের বিশেষ কোনো খাবারের আয়োজন বা আতশবাজির মতো অনৈসলামিক কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।

সর্বোপরি, শবে বরাত মুসলমানদের জন্য তওবা, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির এক মহিমান্বিত সুযোগ। এই রাতে খাঁটি মনে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে, তিনি তাঁর বান্দাকে ক্ষমা করে দেন এবং জীবনের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করেন। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এই রাতকে যথাযথভাবে ইবাদতের মাধ্যমে কাটানো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।

কুরআন ও হাদিসে শবে বরাতের গুরুত্ব

শবে বরাত ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত হিসেবে বিবেচিত হয়, যা হিজরি বর্ষপঞ্জির শাবান মাসের ১৪ তারিখের রাতকে নির্দেশ করে। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর রহমত, ক্ষমা ও বরকত দিয়ে তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেন।

আরও পড়ুন: রমজান নিয়ে স্ট্যাটাস ইসলামিক অনুভূতি প্রকাশের সেরা পোস্ট

কুরআন ও হাদিসে এই রাতের বিশেষ গুরুত্ব সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যদিও সরাসরি "শবে বরাত" শব্দটি কুরআনে উল্লেখ নেই। তবে অনেক ইসলামি বিশেষজ্ঞ কুরআনের কিছু আয়াতকে এই রাতের গুরুত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করেন।

সুরা আদ-দুখান-এর ৩-৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয়ই আমি এক বরকতময় রাতে এই কুরআন অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এই রাতে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয় আমার পক্ষ থেকে" 

অনেক মুফাসসিরের মতে, এখানে "বরকতময় রাত" বলতে লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাতকে বোঝানো হয়েছে। যদিও কিছু আলেমের মতে, এটি লাইলাতুল কদরের প্রতি ইঙ্গিত করে, তবুও শবে বরাতকে গুরুত্ব সহকারে পালন করা অনেক মুসলমানের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় চর্চা।

হাদিসেও শবে বরাতের গুরুত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়। হজরত আয়িশা (রা.) বলেন, এক রাতে রাসূল (সা.)-কে বিছানায় না পেয়ে তিনি খুঁজতে বের হন এবং দেখতে পান, নবী করিম (সা.) জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে আছেন। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করছিলেন।

তখন রাসূল (সা.) বললেন, "শাবান মাসের মধ্যরাত হলো এক বিশেষ রাত, এ রাতে আল্লাহ বান্দাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ বর্ষণ করেন, গুনাহ ক্ষমা করেন এবং দোয়া কবুল করেন। তবে যারা বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করে এবং শিরক করে, তাদের প্রতি দয়া বর্ষিত হয় না।" (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮০)।

আরেকটি হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, "যখন শাবান মাসের মধ্যরাত আসে, তখন আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকান এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।" (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৯০)।

এই হাদিসগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায়, শবে বরাত বিশেষ গুরুত্ববাহী একটি রাত। এটি ইবাদত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। তাই এই রাতে বেশি করে ইবাদত করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য কল্যাণ কামনা করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।

শবে বরাতের রাতে করণীয়

শবে বরাত ইসলামের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ রাত, যা শাবান মাসের ১৪ তারিখের রাতে পালিত হয়। এই রাতটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের রাত হিসেবে পরিচিত। মুসলমানরা এই রাতকে বিশেষ ইবাদত, দোয়া ও তওবার মাধ্যমে কাটিয়ে থাকেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন এবং গুনাহ থেকে মুক্তির সুযোগ দেন। তাই শবে বরাতের রাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল করা উচিত, যা আমাদের আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়ক হবে।

আরও পড়ুন: তাহাজ্জুদ নামাজ সুন্নত নাকি নফল? ফজিলত,নিয়ত ও নিয়ম

এই রাতে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া উত্তম। রাসূল (সা.)-এর সাহাবিরা বিশেষত এই রাতের ইবাদতের ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন। কেউ কেউ রাতভর ইবাদত করতেন, আবার কেউ অর্ধরাতে ঘুমিয়ে থেকে শেষ ভাগে তাহাজ্জুদ পড়তেন। কুরআন তেলাওয়াত করা ও দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই রাতে আল্লাহ বান্দাদের দোয়া কবুল করেন এবং অনুতপ্ত হৃদয়ের গুনাহ ক্ষমা করেন। আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়া ও ভবিষ্যতে ভালো কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত।

এছাড়াও, দরুদ শরিফ পাঠ করা, আল্লাহর প্রশংসা করা ও জিকিরে মশগুল থাকা শবে বরাতের একটি বিশেষ আমল। কারণ আল্লাহর নাম স্মরণ করলে হৃদয় প্রশান্ত হয় এবং ইবাদতে গভীরতা আসে। এই রাতে কবর জিয়ারতের প্রচলনও আছে। রাসূল (সা.) শবে বরাতের রাতে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছিলেন। তবে এটিকে বাধ্যতামূলক মনে না করে ইচ্ছাকৃতভাবে করা উত্তম। কবরবাসীদের জন্য দোয়া করা সুন্নাত, কারণ তারা দোয়ার মুখাপেক্ষী।

শবে বরাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই রাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক জোরদার করা। অনেক সময় পারিবারিক কলহ বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। এই পবিত্র রাতে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে ও ক্ষমা করে দিয়ে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা আল্লাহর রহমত পাওয়ার একটি মাধ্যম হতে পারে।

তবে শবে বরাত উপলক্ষে আতশবাজি ফোটানো, মোমবাতি জ্বালানো, বিশেষ খাবারের আয়োজন করা বা অতিরিক্ত আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠা ইসলামী আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মূলত, শবে বরাতের মূল শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাই এ রাতকে যথাযথভাবে ইবাদতের মাধ্যমে কাটানো উচিত, যেন আমাদের গুনাহ মাফ হয় এবং আগামী জীবনে কল্যাণ লাভ করতে পারি।

শবে বরাত সম্পর্কে ভুল ধারণা

শবে বরাত ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত হিসেবে গণ্য হলেও, অনেক মানুষের মধ্যে এ সম্পর্কে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। এসব ভুল বিশ্বাস ও কুসংস্কার ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং কখনো কখনো ধর্মীয় গোঁড়ামির জন্ম দেয়। তাই শবে বরাত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা এবং ভুল ধারণা পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রথমত, অনেকেই মনে করেন, শবে বরাতের রাতে বিশেষ কোনো নামাজ বা নির্দিষ্ট রাকাতসংখ্যার ইবাদত করতে হয়, যা দ্বারা সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়। বাস্তবে, ইসলামে এমন কোনো নির্দিষ্ট নামাজের কথা উল্লেখ নেই, যা কেবল শবে বরাতের জন্য নির্ধারিত। তবে সাধারণ নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, কুরআন তেলাওয়াত ও দোয়া করা উত্তম আমল হিসেবে গণ্য হয়।

দ্বিতীয়ত, কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যে, শবে বরাতের রাতে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয় এবং পরবর্তী বছরের সুখ-দুঃখ লিখিত হয়। যদিও কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য নেই, তবুও কিছু আলেম কুরআনের আয়াত থেকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আল্লাহর ইলমে সবকিছু পূর্ব নির্ধারিত এবং তা লাইলাতুল কদরে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়। তাই শবে বরাতকে ভাগ্য নির্ধারণের রাত বলা ভুল ধারণা।

আরও পড়ুন: রমজান মাসে ইফতারে ছোলা বা বুট কতটা উপকারি

তৃতীয়ত, অনেক দেশে শবে বরাত উপলক্ষে আতশবাজি ফোটানো, প্রদীপ জ্বালানো এবং বিশেষ ধরনের খাবারের আয়োজন করা হয়, যা ইসলামে অনুমোদিত নয়। রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা কখনো এই ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হননি। বরং শবে বরাতের মূল শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও আল্লাহর রহমত কামনা করা। অতএব, বাহ্যিক উৎসবের মাধ্যমে রাতটি পালন না করে প্রকৃত ইবাদতের মাধ্যমে তা কাটানোই উচিত।

চতুর্থত, কেউ কেউ মনে করেন, শবে বরাতের রাতে কবরস্থান ভ্রমণ করা ফরজ বা ওয়াজিব। যদিও রাসূল (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে দোয়া করেছিলেন, তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক আমল নয়। বরং মুসলমানরা যেকোনো সময় মৃত আত্মীয়-স্বজনের জন্য দোয়া করতে পারেন।

সর্বোপরি, শবে বরাত ইসলামের একটি বরকতময় রাত হলেও, একে ঘিরে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহর ইবাদত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির জন্য ব্যস্ত থাকা উচিত, কুসংস্কার ও বিদআত থেকে দূরে থাকা উচিত।

শবে বরাতের ফজিলত

শবে বরাত ইসলামের একটি মহিমান্বিত ও বরকতময় রাত, যা শাবান মাসের ১৪ তারিখের রাতে পালিত হয়। এই রাতকে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের রাত বলা হয়, কারণ এই রাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের জন্য অসীম দয়া ও ক্ষমার দরজা খুলে দেন। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, যারা আন্তরিকভাবে আল্লাহর দরবারে তওবা করে, আল্লাহ তাদের গুনাহ মাফ করে দেন এবং তাদের ভাগ্যে কল্যাণ লিখে দেন। এই কারণে মুসলিম উম্মাহর কাছে শবে বরাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাত হিসেবে বিবেচিত।

হাদিস অনুযায়ী, রাসূল (সা.) বলেছেন, "যখন শাবান মাসের মধ্যরাত আসে, তখন আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।" (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৯০)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শবে বরাতের ফজিলতের মূল দিক হলো আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ার প্রকাশ। যারা সত্যিকারভাবে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাদের জন্য এটি গুনাহ মুক্তির একটি সুবর্ণ সুযোগ।

এছাড়া, শবে বরাতের আরেকটি বড় ফজিলত হলো, এটি আত্মশুদ্ধি ও পরকালীন জীবনের প্রস্তুতির রাত। এই রাতে যারা ইবাদতে মগ্ন থাকে, তারা আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করে। রাসূল (সা.) শবে বরাতের রাতে নফল নামাজ আদায় করতেন, কুরআন তেলাওয়াত করতেন এবং আল্লাহর কাছে দীর্ঘ সময় ধরে দোয়া করতেন। তাই এই রাতে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা ও দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

শবে বরাতের আরেকটি ফজিলত হলো, এটি ভবিষ্যতের কল্যাণ ও বরকতের জন্য দোয়া করার রাত। এই রাতে আল্লাহর কাছে নিজের ও পরিবারের জন্য কল্যাণ কামনা করা উত্তম আমল। হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা এই রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং যারা দোয়া করে, তাদের দোয়া কবুল করেন। তাই শবে বরাতে আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাওয়া উচিত।

সর্বোপরি, শবে বরাত ইবাদত, দোয়া ও আল্লাহর রহমত লাভের এক মহিমান্বিত সুযোগ। এই রাতের ফজিলত অর্জনের জন্য বিদআত ও কুসংস্কার পরিহার করে, কেবল কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী ইবাদত করা উচিত। আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা ও ইবাদতের মাধ্যমে শবে বরাতকে অর্থবহ করে তোলাই হবে একজন প্রকৃত মুসলমানের করণীয়।

শবে বরাতের ছুটি ২০২৫

শবে বরাত, যা ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত হিসেবে বিবেচিত, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ১৫ ফেব্রুয়ারি শনিবার দিবাগত রাতে পালিত হবে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকার ১৬ ফেব্রুয়ারি রবিবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে, যাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এই রাতে ইবাদত-বন্দেগিতে অংশ নিতে পারেন।

তবে, চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে তারিখে কিছু পরিবর্তন হতে পারে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সাধারণত একদিন আগে শবে বরাত পালিত হয়। তাই, প্রবাসী বাংলাদেশিদের উচিত স্থানীয় ইসলামিক ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে শবে বরাত পালন করা।

শবে বরাতের রোজা কয়টি

শবে বরাতের রোজা সম্পর্কে ইসলামে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই, তবে হাদিস অনুযায়ী, শাবান মাসের রোজার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসূল (সা.) শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতেন এবং উম্মতকেও নফল রোজার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। বিশেষ করে, শবে বরাতের পরদিন অর্থাৎ ১৫ শাবান রোজা রাখা মুস্তাহাব বা সুন্নাত হিসেবে গণ্য হয়। এটি ফরজ নয়, তবে রাখলে সওয়াব পাওয়া যাবে।

হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, "আমি রাসূল (সা.)-কে শাবান মাসের চেয়ে বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।" (বুখারি, মুসলিম)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শাবান মাসের রোজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখা হলে তা নফল ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।

তবে কেউ যদি মনে করেন, শবে বরাতের রোজা রাখা বাধ্যতামূলক, তাহলে তা ভুল ধারণা হবে। এটি একান্তই ইচ্ছাধীন নফল আমল, যা রাখলে অতিরিক্ত সওয়াব পাওয়া যাবে। যারা শাবান মাসের অন্যান্য দিনেও নফল রোজা রাখেন, তারা বিশেষভাবে শবে বরাতের পরদিন রোজা রেখে আল্লাহর রহমত লাভের আশা করতে পারেন।

FAQ

১. শবে বরাত ২০২৫ সালে কবে পড়বে?

২০২৫ সালে শবে বরাত পড়বে ৬ মার্চ, বৃহস্পতিবার।

২. শবে বরাতের রাতে কী করা উচিত?

নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, কোরআন তিলাওয়াত, তওবা ও ইস্তেগফার, দোয়া, এবং সম্ভব হলে রোজা রাখা।

৩. শবে বরাতের ফজিলত কী?

এটি ক্ষমার রাত, যেখানে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করেন এবং দোয়া কবুল করেন।

৪. শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখা কি বাধ্যতামূলক?

না, এটি নফল রোজা, যা রাখা যেতে পারে তবে বাধ্যতামূলক নয়।

৫. শবে বরাত সম্পর্কে হাদিস কী বলে?

কিছু হাদিসে শবে বরাতের গুরুত্ব উল্লেখ রয়েছে, তবে অনেক স্কলার এসব হাদিসকে দুর্বল বা জয়িফ বলেছেন।

৬. শবে বরাতের রাতে আতশবাজি করা কি ইসলামসম্মত?

না, ইসলামিক শিক্ষায় এর কোনো ভিত্তি নেই।

৭. শবে বরাতের রাত কি বিশেষভাবে পালন করতে হবে?

এই রাতে ইবাদতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, তবে কোনো অতিরিক্ত আচার-অনুষ্ঠান পালন করা বাধ্যতামূলক নয়।

৮. শবে বরাতের নামাজের কোনো নির্দিষ্ট রাকাত আছে?

না, নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই, তবে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া ভালো।

৯. শবে বরাতের রাতে দোয়া কবুল হয় কি?

হ্যাঁ, এটি ক্ষমার রাত, তাই এ রাতে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

১০. শবে বরাত পালনের সঠিক পদ্ধতি কী?

ইবাদত করা, দোয়া করা, কোরআন পড়া, এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

লেখক এর মন্তব্য

শবে বরাত মুসলমানদের জন্য একটি মহিমান্বিত রাত, যা ক্ষমা ও দোয়ার বিশেষ সুযোগ এনে দেয়। আমাদের উচিত এই রাতটি যথাযথ ইবাদতের মাধ্যমে কাটানো এবং ইসলামের মূল শিক্ষার আলোকে আমল করা। শবে বরাত পালনের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানা এবং ভুল ধারণা থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন